আফগানদের হারালো বাংলাদেশ শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে…

বাংলাদেশকে হারাতে শেষ ওভারে আফগানিস্তানের প্রয়োজন ছিলো ৮ রান, উইকেট ছিলো ৬টি। কিন্তু মোস্তাফিজের কাটার জাদুতে এমন সহজ সমীকরণের জয়টিও দলটি তুলে নিতে পারেনি। ফিজের কৌশলী বোলিংয়ের সামনে ৩ রানে অসহায় আফগানদের আত্মসমর্পন করতে হলো।

এশিয়া কাপে টানা দুই ম্যাচ হারে পুরো টাইগার শিবিরেই বিরাজ করছিলো অস্বস্তি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আফগানদের কাছে হারের পর ভারতের বিপক্ষেও মাশরাফিরা হারের গ্লানি থেকে রেহাই পায়নি। অবশেষে নিজেদের বাঁচা-মরার ম্যাচে সেই আফগানদের হারিয়েই হারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলো লাল-সবুজের দল।

২৪৯ রানের মোটামুটি সংগ্রহ নিয়েও মাশরাফি, মোস্তাফিজদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং আফগানদের কপালে হারের কালিমা লেপ্টে দিয়েছে। ফাইনালের টিকিট পেতে শেষ ম্যাচে ২৬ সেপ্টেম্বর সুপার ফোরে পাকিস্তানকে হারাতে পারলেই কেল্লাফতে।

মাশরাফিদের দেয়া ২৫০ রানের লক্ষ্যে খেলতে নামা আফগানরা ৭ উইকেটের বিনিময়ে সংগ্রহ করেছে ২৪৬ রান।

স্কোরই বলছে লক্ষ্যটা খুব একটা আহামরি রকমের ছিলো না। কিন্তু তারপরেও নিজেদের শেষ রক্ষা করতে পারেনি কাবুলিওয়ালার দেশ আফগানিস্তান। বলার অপেক্ষা রাখছে না ফাইনালের মিশনে দু’দলের জন্যই ম্যাচটি হয়ে উঠেছিলো বাঁচা মরার। সেই ম্যাচে বল হাতে এসেই উইকেটের দেখা পান টাইগার কাটার স্পেশালিস্ট মোস্তাফিজুর রহমান।

৫ম ওভারে নিজের প্রথম ডেলিভারিতে ইহসানুল্লাহকে নাজমুল হোসেন শান্তর ক্যাচে পরিণত করেন। ১১ বল খেলে ২ চারে ৮ রান সংগ্রহ করে দলকে ২০ রান এনে দিয়ে ফেরেন এই ওপেনার।

অবশ্য দলটির প্রথম উইকেটের পতন আগের ওভারেই হতে পারতো। যদি না নাজমুল ইসলাম অপুর বলে মিডঅনে মোহাম্মদ শাহজাদের ক্যাচটি মোহাম্মদ মিঠুন ফেলে না দিতেন।

ইহসানুল্লাহ ফেরার পর দলের সঙ্গে ৬ রান যোগ হতে না হতেই ব্যক্তিগত ১ রানে ফেরেন আফগান টপ অর্ডার রহমত শাহ। ৮ম ওভারে নাজমুল ইসলাম অপুর দ্বিতীয় ডেলিভারিতে প্রথম রান কাভারেরর পর দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে ক্রিজের অপর প্রান্তে থাকা মোহাম্মদ শাহজাদের সঙ্গে ভুলবোঝাবুঝিতে সাকিবের সরাসরি থ্রোতে কাটা পড়েন।

তৃতীয় উইকেটে হাসমতউল্লাহ শহিদিকে সঙ্গে নিয়ে টাইগারদের ওপর ব্যাট হাতে চোখ রাঙাচ্ছিলেন মারকুটে ওপেনার মোহাম্মদ শাহজাদ। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ তা স্থায়ী হয়নি। ব্যক্তিগত ৫৩ রানে তাকে বোল্ড আউট করে দলকে ব্রেক থ্রু এনে দেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ফিরে যাওয়ার আগে এই জুটিতে সংগ্রহ করেন ৬৩ রান।

এই ম্যাচ দিয়েই ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ১৩তম অর্ধশতকের দেখা পেয়েছেন শাহজাদ।

তারপরেও যেন তাদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছিলো না। চতুর্থ উইকেটে অধিনায়ক আসগর আফগানকে সঙ্গে নিয়ে রানের চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন শহিদি। অবশেষে তা থামিয়ে দিলেন টাইগার দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা। ৪০ তম ‍ওভারে তার ৪র্থ ডেলিভারিতে আসগরকে ব্যক্তিগত ৩৯ রানে মাহমুদউল্লাহর তালুবন্দি করে। আবার জেগে উঠলো বাংলাদেশ শিবির।

পঞ্চম উইকেটটিও এলো ওই মাশরাফির কল্যাণে। ৪৪তম ওভারে নিজের ৪র্থ বলে ক্লিন বোল্ড করেন সেট ব্যাটসম্যান শহিদকে। আর এই উইকেট দিয়েই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে ২৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন দিন বদলের এই দলপতি।

ষষ্ঠ উইকেটেও মোহাম্মদ নবী ও সামিউল্লাহ শেনওয়ারি টাইগারদের ওপর চোখ রাঙাচ্ছিলেন। কিন্তু ৪৮তম ওভারে সাকিব জাদুতে ব্যক্তিগত ৩৮ রানে নবী নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ধরা পড়লে উল্লাস ফেরে লাল সবুজের দল।

আফগানদের হারের কফিনের শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন মোস্তাফিজ। ৫০ তম ওভারে বল হাতে এসে কাটারের পসরা সাজিয়ে নিজের দ্বিতীয় বলে রশিদ খানকে ৫ রানে কট এন্ড বোল্ড করলে সেই উল্লাস আরও বেড়ে যায়। তবে জয় নিশ্চিত হয়নি। কেননা শেষ ৪ বল থেকে তাদের প্রয়োজন ছিলো ৬ রান।

কিন্তু বিধি বাম। মোস্তাফিজ এমনই কাটার জাদু চালালেন যাতে করে পুরোপুরি পরাস্ত হলেন সামিউল্লাহ শেনওয়ারি ও গুলবাদিন নাইব। ১৯ বলে অপরাজিত ২৩ রান করেও চোখের সামনে মুঠো গলে ম্যাচটি বেরিয়ে যেতে দেখলেন সেট ব্যাটসম্যান শেনওয়ারি।

ফলে ৩ রানের স্বস্তির জয় ধরা দিল মাশরাফি শিবিরে।

এর আগে বাংলাদেশের ব্যাটিং ইনিংসের শুরুটাও ভাল হয়নি। ম্যাচের পাওয়ার প্লেতে দুই উইকেট হারানোর পর ১৯ ও ২১তম ওভারে পরপর তিন উইকেট হারিয়ে দলকে অবর্ণনীয় চাপ এনে দিয়েছিলেন সাকিব, মুশফিক ও লিটন দাস। দৃঢ় ব্যাটে সেখান থেকে দলকে টেনে তুল ২৪৯ রানের চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ এনে দেন দুই অভিজ্ঞ টাইগার ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও ইমরুল কায়েস।

রিয়াদের ব্যাট থেকে এসেছে অমূল্য ৭৪ রান। তবে শেষ পর্যন্ত উইকেটে থাকতে পারেননি। ৪৭তম ওভারে আফতাবের বলে রশিদ খানের ক্যাচ হয়ে ফিরেছেন। তবে ইনিংসের শেষ পর্যন্ত ছিলেন ইমরুল। দায়িত্বশীল ব্যাটে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৫তম হাফসেঞ্চুরি তুলে নিয়ে সংগ্রহ করেছেন মহামূল্যবান অপরাজিত ৭২ রান।

দু‘জনের এমন দায়িত্বশীল ব্যাটে ৭ উইকেটের বিনিময়ে আফগানদের বিপক্ষে এই সংগ্রহ পায় কোচ স্টিভ রোডসের শিষ্যরা।

তবে এও ঠিক ১৯তম ওভারে রশিদ ঘূর্ণিতে ক্রমাগত বিপদজনক হয়ে উঠা লিটন ৪১ রানে ফিরে গেলেও তার ওই ওভারে হন্তদন্ত হয়ে ছোটা সাকিব (০) ও একওভার বিরতিতে সেট ব্যাটসম্যান মুশফিকও (৩৩) রান আউট না হলে দলীয় সংগ্রহের ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হতে পারতো।

কিন্তু শতক, অর্ধশতক করতে না পারলেও এই ম্যাচটি দিয়েই বাংলাদেশের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ৫ হাজার রানের ঘরে ঢুকেছেন মুশফিকুর রহিম।

রোববার (২৩ সেপ্টেম্বর) আফগানদের বিপক্ষে এই ম্যাচে রিয়াদ তুলে নিয়েছেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২০তম অর্ধশতক। এই রান সংগ্রহে তিনি খেলেছেন ৫৯ টি বল। যেখানে কোনো ছক্কার মার ছিলো না। ছিলো শুধু ৩টি চারের মার।

এর আগে আবুধাবি শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই হারায় ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্তকে। ৫ম ওভারে আফতাব আলমের একেবারে শেষ বলটি কাভারে উঠিয়ে দিলে তা তালুবন্দি করেন রহমত শাহ। ফিরে যান ব্যক্তিগত ৬ রানে।

ঠিক তার পরের ওভারেই মুজিব উর রহমানের স্পিনে ব্যক্তিগত ১ রানে এলবি’র ফাঁদে পড়েন মোহাম্মদ মিঠুন।

পা হড়কেছিলেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকও। তখন তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ ৯। ১২.৫ ওভারে মুজিব উর রহমানকে কাট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠিকমতো খেলতে পারেননি। বল ব্যাটের কানা ছুঁয়ে কিপার মোহাম্মদ শাহজাদের পায়ে লেগে যায় প্রথম স্লিপে। কিন্তু মুঠোবন্দি করতে পারেননি।

১৯তম ওভারে বল হাতে এসে বাংলাদেশ শিবিরকে বিপর্যস্ত করে তোলেন আফগান লেগি রশিদ খান। একেবারে প্রথম ওভারের ৪ নাম্বার বলে ব্যক্তিগত ৪১ রানে ইহসানুল্লাহর হাতে তুলে দেন বিপদজনক হয়ে ওঠা লিটন দাসকে।

দুই বল বিরতিতে রানআউটের ফাঁদে পড়ে শূন্য রানে ফিরে যান সাকিব। এক ওভার পরেই আরেকবার রানআউট ফাঁদে পড়েন সেট ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ।

ষষ্ঠ উইকেটে ইমরুলকে সঙ্গে নিয়ে ১২৮ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দলকে ২১৫ রান এনে দিয়ে রিয়াদ ফিরে যান। পরের উইকেটে ২১ রান যোগ করে ব্যক্তিগত ১০ রানে আফতাবের শিকার বনে যান মাশরাফি।

তার বিদায়ের পর মিরাজ নেমে ইমরুলের সঙ্গে ২৩ রান যোগ করে দলকে ২৪৯ রান এনে দিয়ে ইনিংসের সমাপ্তি টানেন। মিরাজের সংগ্রহ ছিল অপরাজিত ৫ রান।

দারুণ ব্যাটিংয়ের সঙ্গে একটি উইকেট ও এক ক্যাচে ম্যাচ সেরা হয়েছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

বাংলাদেশ সময়: ০১৩৭ ঘণ্টা, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

5 (100%) 1 vote